বোরিং সাবিক

“বাবা চলো বৃষ্টিতে ভিজি, আজকে শরতের প্রথম দিন।”

ছেলের এই ঘোষণায় আমি চমকে উঠলাম। শরৎ এসেছে সেটা তো আমি টেরই পাইনি। আমি অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলাম,
— “আজকে শরৎ তোমাকে কে বলল?”

ছেলে উত্তর দিলো খুবই ভদ্রভাবে,
— “স্কুল থেকে আপুমনিরা বলেছে।”
(ওদের স্কুলে ম্যাডামদের সবাই আপু মনি বলে ডাকতে হয়। শুনতে একটু মজাই লাগে, ম্যাডাম না হয়ে সবাই আপু মনি!)

আমি বললাম,
— “ও আচ্ছা…”

ছেলে শরতের বৃষ্টিতে ভিজতে চাইলো। আমি দেইনি। ঠান্ডা লাগলে তো ঝামেলা আমাদেরই সামলাতে হবে। তবে মনে মনে খুব খুশি হলাম। অন্তত ছেলের ভেতরে পুরোনো বাংলার টানটা এখনো আছে।

আমি নিজেও তো একসময় বাংলাদেশের মিডিয়া জগতে ঢুকেছিলাম। আস্তে আস্তে ঢুকছিলাম, কিন্তু পুরোটা ঢোকার আগেই বের হয়ে আসতে হলো। বাধা-বিপত্তি সামলাতে পারিনি। আজকে যদিও আমি প্রতিষ্ঠিত, তবু পুরোনো দিনের কথা খুব মনে পড়ে।

ছেলেকে যখন দেখি তখন মাঝে মাঝে অবাক হই। এই যুগে যেখানে এআই টেকনোলজি এসে গেছে, সেখানে আমার ছেলে উচ্চাঙ্গ সংগীতে মগ্ন। রবীন্দ্রসংগীত গাইছে, নজরুলসংগীত গাইছে। নিজের মতো ছবি আঁকছে, ক্রাফট বানাচ্ছে। আমার খুব ভালো লাগে। মাঝেমধ্যে আফসোস হয়—যদি আবার ফিরে যেতে পারতাম। যে বাধাগুলো এসেছিল, কোনো না কোনোভাবে সামলে নিতে পারতাম হয়তো।

আমার মেয়েকে দেখে মাঝে মাঝে ভয় পেতাম। ভাবতাম, বাংলাদেশের পুরোনো ঐতিহ্য একদিন হারিয়ে যাবে। সে সারাদিন এআই নিয়ে ব্যস্ত। কিন্তু ছেলেকে দেখলেই ভয়টা কেটে যায়। ও এআই–এর উপর নির্ভরশীল না। নিজের পছন্দকে প্রাধান্য দেয়। ভাবি—ওর মতো কেউ না কেউ থাকবেই, যারা পুরোনো সংস্কৃতিটা ধরে রাখবে।

ছেলেকে আমি বারবার বলেছি,
— “বাবা, বইও পড়তে হবে। শুধু ক্লাস টিচারদের উপর নির্ভর করলে হবে না। যাদের গান করছো, যাদের ছবি আঁকছো, তাদের সম্পর্কেও জানতে হবে।”

কিন্তু আফসোস, বই হাতে নিতে চায় না। বলে—বই পড়তে ভালো লাগে না। একাডেমিক বই ছাড়া আর কিছু পড়ে না। শেষমেশ আমি বিরক্ত হয়ে বলি,
— “যা ভাগ, যা খুশি কর।”

আমার ছেলে কতটা বোরিং, একটা উদাহরণ দিই।

আমরা প্রতি ৪–৫ মাস অন্তর পরিবার নিয়ে ঘুরতে যাই। গাড়িতে ওঠার পর গান বাজানো নিয়ে শুরু হয় যুদ্ধ। আমার ছেলে ছাড়া বাকি সবার চয়েস প্রায় একই রকম। কিন্তু ছেলের পছন্দ একেবারেই আলাদা।

ও যখন বলে, “আমি গান সিলেক্ট করি,” আমরা সবাই একসাথে চিৎকার করি—
— “ও নোওওওওও, প্লিজ সাবিক!”

ছেলে তখন বিরক্ত হয়ে বলে,
— “কেউ আমার পছন্দের গুরুত্ব দেয় না।”

আমরা শান্ত করার জন্য বলি,
— “আচ্ছা দাও, তোমার গান দাও।”

তখন শুরু হয় রবীন্দ্রসংগীত বা নজরুলসংগীত। একটু শোনার পর আমি শান্ত গলায় বলি,
— “বাবা, অন্য গান দাও না প্লিজ। আমার ঘুম পাচ্ছে। ঘুম পেলে কিন্তু অ্যাক্সিডেন্ট হয়ে যাবে।”

অ্যাক্সিডেন্টের নাম শুনে ছেলে ভয়ে আমাদের পছন্দের গান বাজায়। কিন্তু এখন আর ফাঁদে পড়ে না। বুঝে গেছে আমি ইচ্ছে করে বলি। এখন অ্যাক্সিডেন্টের নাম নিলেও শোনে না। আর আমাকে ২০০ থেকে ৪০০ কিমি ড্রাইভ করতে হয়। মেয়ে আর ওয়াইফ হেডফোন কানে দিয়ে নিশ্চিন্তে বসে থাকে, সাবিক মাথা দুলতে থাকে, আর আমি একলা ড্রাইভার। আমার অবস্থা কেমন হয়, নাই বা বললাম।

মেয়েকে দেখে ভাবতাম, আমাদের ঐতিহ্য হয়তো মুছে যাবে। কিন্তু ছেলেকে দেখলেই মনে হয়—সব হারিয়ে যায়নি। এখনো কেউ কেউ আছে, যারা পুরোনো সংস্কৃতি আঁকড়ে ধরবে।

বইয়ের কথা যখন এলো, আরেকটু বিরক্ত করি।

আমি কিছুদিন যাবত দুইটা বই নিয়ে কাজ করছি। একটা আমার লেখা, আরেকটা অনুবাদ। আমার লেখা বইয়ের পাণ্ডুলিপি অনেক প্রকাশকের কাছে পাঠালাম। সবাই বলল,
— “ভাই, বই বিক্রি দিন দিন কমছে। নতুন লেখকের বই এখন রিস্ক। যদি ৫০% শেয়ার করেন তাহলে ভেবে দেখতে পারি।”

অনুবাদের স্যাম্পল দিলাম। বললাম—মূল প্রকাশকের কাছ থেকে অনুমোদন নিন। স্যাম্পল দেখে অনেক প্রকাশক প্রশংসা করলো। তারপরও একই কথা—বই বিক্রি কমে গেছে, মূল প্রকাশক যদি টাকা চায় , তাহলে তো ভাই সমস্যা ।

আমি ব্যাপারটা বিশ্বাস করতে চাই না। বাংলাদেশের মানুষ বই কিনে না—এটা আমি মানতে চাই না। যাই হোক, এআই–এর মাধ্যমে কিছু ডাটা কালেকশন করলাম। রিপোর্ট দেখে মাথা পুরাই উল্টোপাল্টা হয়ে গেলো।

About the author

সুমন ভূইয়াঁ

Add Comment

সুমন ভূইয়াঁ

কলমের কথায়, আপনার সঙ্গে

গল্প, অনুভূতি আর জীবনের টুকরো কথাগুলো নিয়ে আমি লিখি — আপনাদের সঙ্গে সেই গল্পগুলো ভাগ করতেই “কলমে আমি”।
আপনার কোনো মতামত, প্রশ্ন, পরামর্শ বা শুধু শুভেচ্ছা জানাতেও পারেন।
প্রত্যেকটি বার্তা আমার কাছে গুরুত্বপূর্ণ, কারণ আপনাদের ভালোবাসাতেই এই পথচলা আরও সুন্দর হয়ে ওঠে।
ইমেইল: sumonbhuiyan1432@gmail.com

Follow Me